আপডেট: সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
বিভুরঞ্জন থেকে পুলক: সাংবাদিকদের জন্য সতর্কসংকেত
——————————– রশিদ আহাম্মদ আব্বাসী
একজন সাংবাদিকের মৃত্যু কখনোই কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়। কারণ সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়—এটি সমাজের বিবেকের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী যখন জীবনের প্রতি আস্থা হারিয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেন, তখন তাঁর ব্যক্তিগত বেদনার পাশাপাশি আমাদের পেশাগত কাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব—সবকিছুকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছিল। এবার সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যু সেই একই প্রশ্নকে আরও নির্মমভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলক চ্যাটার্জী দীর্ঘদিন সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন, বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং একসময় একটি জাতীয় দৈনিকের বরিশাল ব্যুরো প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মৃত্যুর আগে তিনি স্ত্রী, মেয়ে, ভাই ও সহকর্মীদের উদ্দেশে পৃথক চিরকুট রেখে যান। তাঁর পাওনা অর্থের বিষয়টিও সেখানে উঠে এসেছে।
এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আসে—একজন দীর্ঘদিনের সাংবাদিক, যিনি মানুষের দুঃখ-কষ্টের খবর লিখেছেন, তিনি নিজেই যখন অসহায় হয়ে পড়েন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়ানোর মতো প্রতিষ্ঠান কোথায় ছিল?
সাংবাদিক সমাজের প্রতি বার্তা
প্রথম বার্তাটি খুবই স্পষ্ট—সহকর্মীর কষ্টকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একজন সাংবাদিক চাকরি হারালে, আয় বন্ধ হলে, দীর্ঘদিনের পাওনা আটকে গেলে, পারিবারিক সংকটে পড়লে কিংবা মানসিকভাবে ভেঙে পড়লে শুধু ‘ভালো থাকবেন’ বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সাংবাদিক সংগঠন, প্রেসক্লাব, সংবাদমাধ্যমের মালিক ও সম্পাদকদের একটি কার্যকর সহায়তা কাঠামো তৈরি করতে হবে।
বিশেষ করে প্রবীণ সাংবাদিকদের জন্য অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা, চিকিৎসা সহায়তা, জরুরি আর্থিক তহবিল, চাকরি হারালে সাময়িক সহায়তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
কারণ একজন সাংবাদিক যখন প্রতিষ্ঠানকে তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু দেন, প্রতিষ্ঠানটিরও তাঁর দুর্দিনে কিছু দায় থাকা উচিত।
গণমাধ্যম মালিকদের জন্য সতর্কবার্তা
পুলক চ্যাটার্জীর মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর চাকরি হারানো এবং আর্থিক সংকটের বিষয়টি সংবাদ প্রতিবেদনে এসেছে। তাঁর একটি চিরকুটে সাবেক কর্মস্থলে পাওনা টাকা আদায়ের অনুরোধও ছিল। তবে এসব তথ্যকে তাঁর মৃত্যুর একক বা নিশ্চিত কারণ হিসেবে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা উচিত নয়; তদন্ত ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবু ঘটনাটি সংবাদমাধ্যম মালিকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখে যায়—কর্মীকে কি শুধু কর্মক্ষম অবস্থাতেই প্রয়োজন, নাকি তাঁর মানবিক অস্তিত্বের প্রতিও প্রতিষ্ঠানের দায় আছে?
বেতন, বকেয়া পাওনা, চাকরিচ্যুতি, অবসর, ক্ষতিপূরণ—এসবকে নিছক প্রশাসনিক ফাইল হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলোর সঙ্গে একজন মানুষের পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং মর্যাদা জড়িয়ে থাকে।
রাষ্ট্রের প্রতি বার্তাঃ
রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়।
সাংবাদিকরা গণতন্ত্রের পাহারাদার হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু তাঁদের নিজেদের জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা যদি অনিশ্চিত থাকে, তাহলে স্বাধীন সাংবাদিকতার ভিতও দুর্বল হয়ে যায়।
রাষ্ট্রকে তাই সাংবাদিকদের জন্য এমন একটি সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে ভাবতে হবে, যেখানে চাকরি হারানো, বার্ধক্য, অসুস্থতা বা আকস্মিক বিপর্যয়ের সময় একজন সাংবাদিক সম্পূর্ণ অসহায় হয়ে পড়বেন না।
তবে রাষ্ট্রীয় সহায়তার নামে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়—এটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। সহায়তা চাই, করুণা নয়; নিরাপত্তা চাই, নিয়ন্ত্রণ নয়।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা—মানুষটির খবর নিতে হবে
আমরা সাংবাদিকরা প্রতিদিন অন্যের খবর নিই। কে মারা গেলেন, কে নিখোঁজ, কার বাড়ি পুড়ল, কে নিঃস্ব হলেন—এসব খবর আমরা সংগ্রহ করি।
কিন্তু আমাদের পাশের ডেস্কে বসা মানুষটির মন কেমন আছে—সেই খবর কি আমরা নিই?
একজন সহকর্মী হঠাৎ চুপ হয়ে গেলে, দীর্ঘদিন বেতন না পেলে, চাকরি হারালে, ঋণে জর্জরিত হলে কিংবা বারবার হতাশার কথা বললে—তাঁকে ‘দুর্বল’ বলে দূরে সরিয়ে না দিয়ে পাশে দাঁড়ানো দরকার।
একটি ফোন, একটি আন্তরিক আলাপ, একটি আর্থিক সহায়তা, একটি চাকরির সুযোগ—কখনো কখনো একজন মানুষকে আবার জীবনের দিকে ফিরিয়ে দিতে পারে।
আত্মহনন কোনো সমাধান নয়ঃ
বিভুরঞ্জন সরকার কিংবা পুলক চ্যাটার্জীর মতো সাংবাদিকদের মৃত্যু আমাদের আবেগতাড়িত করার পাশাপাশি আত্মসমালোচনার সুযোগও করে দেয়। তাঁদের মৃত্যুকে রোমান্টিক করে দেখা বা আত্মহননকে কোনো প্রতিবাদের মহৎ প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।
বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে একজন মানুষ মনে করলেন যে তাঁর সামনে আর কোনো পথ নেই?
সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে পরিবারে, কর্মস্থলে, সাংবাদিক সংগঠনে, রাষ্ট্রীয় নীতিতে এবং সর্বোপরি আমাদের মানবিক আচরণে।
শেষ কথাঃ
বিভুরঞ্জন থেকে পুলক—এই ধারাবাহিক মৃত্যু আমাদের জন্য কোনো পরিসংখ্যান নয়; এটি একটি সতর্কসংকেত মাত্র।
সাংবাদিকের হাতে মাইক্রোফোন থাকলেই তিনি নিরাপদ নন। প্রেস কার্ড থাকলেই তাঁর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত নয়। দীর্ঘ সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা থাকলেই বার্ধক্যে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।
তাই এখন সময় এসেছে সাংবাদিক সমাজের নিজেদের দিকে তাকানোর এবং রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম মালিকদের কাছে স্পষ্টভাবে বলার—
যে মানুষটি সারাজীবন অন্যের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছেন, তাঁর নিজের কণ্ঠ যেন অসহায় নীরবতায় হারিয়ে না যায়।
একজন সাংবাদিকের মৃত্যু আমাদের শোকাহত করবে,আমরা কাঁদবো—কিন্তু **আরেকজন সাংবাদিককে যেন একই পরিণতির দিকে যেতে না হয়, সেই ব্যবস্থা করাই হবে তাঁর প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা।**
লেখক :
রশিদ আহাম্মদ আব্বাসী,গণমাধ্যম কর্মী।
আহবায়ক, কালিহাতী প্রেসক্লাব, কালিহাতী, টাঙ্গাইল।