২৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, বুধবার

 

দেশে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে শংকায় শিক্ষার্থীরা

আপডেট: জুন ১১, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

নেক্সটনিউজ ডেস্ক : সারাদেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ায় গত একবছরের বেশি সময় ধরে স্কুল কলেজ বন্ধ। ভাইরাসের ঊর্ধ্বমূখী সংক্রমণের মুখে চলতি বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কিভাবে নেয়া হবে অনলাইন পরীক্ষা?-সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কমিটি কাজ শুরু করেছে। অপরদিকে আগের মতই স্বশরীরে এসএসসি পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের যে আর অটোপাস দেয়া হবে না বিষয়টিও স্পষ্ট করেছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্তারা। এসএসসি-এইচএসসিসহ অন্যান্য পাবলিক পরীক্ষাগুলো কিভাবে নেয়া হবে?-সে প্রশ্ন শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের। তবে, সংশ্লিষ্টদের মতে বাংলাদেশের আর্থসামাজিত প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ‘অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া সম্ভব নয়’-এমনটাই মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

দীর্ঘদিন সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করার পর শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা এক কর্মকর্তা অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষার বিষয়ে দি নেক্সটনিউজকে  বলেছেন, পাবলিক পরীক্ষা সবার পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। তবে, বাস্তবতা হলো আমাদের দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থা ও শিক্ষা পদ্ধতি বিবেচনায় নিলে অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার সক্ষমতা আমরা এখনো অর্জন করতে পারিনি। অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার মত বড় কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের সক্ষমতাও আমাদের হয়নি। অনলাইনে পরীক্ষা নিতে হলে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ও সার্বক্ষণিক ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তাছাড়া দেশের সব জায়গার শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেটের সাথে সম্পৃক্ততা আরও বাড়াতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে গত এক বছরে সরকার দেশবাসীকে অনেকটুকু ইন্টারনেটে সম্পৃক্ত করতে পারলেও বাস্তবতা এইযে, পাবলিক পরীক্ষার মত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা আয়োজনের জন্য আমরা এখনো সক্ষম না।

এদিকে শিক্ষা বোর্ডগুলোর সাথে সম্পৃক্ত কর্মকর্তা ও শিক্ষকরা সাংবাদিকদের  বলছেন, আমাদের কারিকুলাম বা শিক্ষা পদ্ধতি অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়ার মত না। যে পদ্ধতিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা চলছে তাতে ‘ওপেনবুক এক্সাম’ বা ‘বই খুলে পরীক্ষা’ দেয়ার চর্চা আমাদের দেশে নেই। সনাতন পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেয়ার প্রচলন আছে। যে পদ্ধতির সিলেবাস শিক্ষার্থীরা পড়ছে তাতে ‘ওপেনবুক পরীক্ষা’ নেয়া যাবে না। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরাও এ পদ্ধতির সাথে পরিচিত না। সার্বিক বিবেচনায় অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নেয়া বর্তমান প্রেক্ষপটে অসম্ভব।

শিক্ষকরা নেক্সটনিউজকে  বলেন, বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী আমাদের দেশের পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেয়। তারা সারাদেশ থেকেই অংশ নেন। এ বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে নতুন একটি পদ্ধতির সাথে পরিচিত করতে হবে অনলাইনে পরীক্ষা আয়োজনের সিদ্ধান্ত হলে। সব শিক্ষার্থী যাতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায় তা নিশ্চিত করতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোকে। নিশ্চিত করতে হবে তাদের জন্য পরীক্ষা দেয়ার ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ। তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যাবে। শহরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য তা নিশ্চিত করা গেলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য তা নিশ্চিত করা সম্ভব না।

শিক্ষকরা আরও বলেন, বিভিন্ন উন্নত দেশে যে পদ্ধতিতে অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া হয় তা পাবলিক পরীক্ষার জন্য না। কোন ক্লাস পরীক্ষা বা কোন একটি ব্যাচের পরীক্ষা নেয়া যেতে পারে। তবে, কয়েকলাখ শিক্ষার্থীর পাবলিক পরীক্ষা একসাথে নেয়া কঠিন হয়ে যাবে।

রাজধানীর বিটিসিএল মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক মজিবুর রহমান বাবুল দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, রাজধানীর একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হয়েও আমরা যখন অনলাইন ক্লাস পরিচালনা করতে গেলাম, আমরা দেখতে পেলাম অনেক শিক্ষার্থীর ডিভাইস নেই। ডিভাইস থাকলেও তা তার বাবা বা মায়ের যিনি ক্লাসের সময় থাকছেন না। অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েও সমস্য হচ্ছে। তাই অনলাইনে পরীক্ষা নিতে হলে শিক্ষার্থীদের ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

শিক্ষার্থীরা দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেছেন, অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নিতে হলে সব শিক্ষার্থীর ডিভাইস ও ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সাভার ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থী জাহারু তুস মেহের ঐক্য দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, শহরাঞ্চলে তা নিশ্চিত করা সম্ভব হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া সম্ভব না। দেশের সব জায়গায় একই গতির ইন্টারনেট পাওয়া যায় না। শিক্ষার্থীদের ডিভাইসেরও একটা বিষয় আছে। গুগল ফরমের মত প্লাটফর্মে যখন আমাদের কলেজের পরীক্ষা হয় ৭০-৮০ জন শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই জটিলতা সৃষ্টি হয়। সময় শেষ হলেও অনেকের অনলাইন ‘অ্যান্সার শিট’ সাবমিট হয়না। বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেয়া হলে কি হবে তা বোঝা যায়। ১২-১৪ লাখের মত পরীক্ষার্থী পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নেবেন। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা বোর্ডগুলো যদি তাদের শিক্ষার্থীদের আলাদা আলাদাভাবে নেয় সে ক্ষেত্রেও যে ধরণের সার্ভার প্রয়োজন তাও দিয়েও কি এ পরীক্ষা অংশগ্রহণ করা যাবে কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। আর প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পরীক্ষা নেয়া হলে বৈষম্যের শিকার হবে।

শিক্ষার্থীদের কারো কারো মতে, শিক্ষার্থীরা যে পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে অভ্যস্ত অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নিতে হলে তাও পরিবর্তন করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীদের ফল বিপর্যয়ের আশঙ্কা আছে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কিশোয়ার সাম্য দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেন, মহামারী পরিস্থিতিতে আমরা পরীক্ষা নেয়ার কথা ভাবছি। কিন্তু এ মহামারী পরিস্থিতিতে পরীক্ষা নেয়াটাই বা কতটা প্রয়োজন সে বিষয়টিও ভাবার আছে। আবার অনলাইনে পরীক্ষা নিতে নানা প্রতিবন্ধকতাও আছে। সেগুলোর মধ্যে শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ও ডিভাইস সংকট আছে। সে বিষয়গুলো নিয়েও ভাবতে হবে।

গত ২৪ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে অনলাইনে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়েরর শ্রেণি পরীক্ষা ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে সুপারিশ করতে ১১ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলছে, এ কমিটি দেশে ও বিদেশে অনলাইনে পরীক্ষা গ্রহণের বর্তমান প্রাকটিসগুলো পর্যালোচনা করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী রোডম্যাপ তৈরি করবে এবং এ বিষয়ে প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়কে জানাবে।

অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে সর্বশেষ জানতে দৈনিক শিক্ষাডটকমকে পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছিল ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের গঠিত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক নেহাল আহমেদের সাথে। তিনি দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানিয়েছেন, অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষার নেয়ার বিষয়ে সুপারিশ করতে কমিটি বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দিয়েছে পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোতে কিভাবে অনলাইন পরীক্ষা নেয়া হয় সে তথ্য সংগ্রহ করতে। বিশেষজ্ঞরা তথ্য সংগ্রহ করেছেন। তবে, তারা বেশিরভাগই নেতিবাচক মত দিয়েছেন। সেগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।

এদিকে কমিটির সাথে জড়িত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক শিক্ষাডটকমকে বলেছেন, অনলাইনে পাবলিক পরীক্ষা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে আমরা দেখছি পৃথিবী যেসব দেশে অনলাইনে পরীক্ষা নিচ্ছে তারা একই সাথে অনেক শিক্ষার্থীর পরীক্ষা নিচ্ছে না। একটি ক্লাস বা শ্রেণির পরীক্ষা নিচ্ছে। তাদের পরীক্ষা পদ্ধতিও আলাদা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ওপেনবুক পরীক্ষা নেয়া হচ্ছে। সে প্রেক্ষিতে আমাদের ১৪ থেকে ১৫ লাখ শিক্ষার্থী প্রতিটি পাবলিক পরীক্ষায় অংশ নেয়। এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। কমিটি সার্বিক বিষয়ে আলোচনা করেই সুপারিশ তৈরি করবে ও তা মন্ত্রণালয়কে জানাবে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অনলাইনে পরীক্ষা সাধারণ মানুষের কাছে কিছুটা জটিল। তবে, কমিটি সারা বিশ্ব থেকে তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করছে। তারপর সবাই আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

করোনার কারণে এক বছরের বেশি সময় ধরে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ। সংক্ষিপ্ত পাঠ্যসূচিতে ৬০ দিন শ্রেণিকক্ষে ক্লাস করিয়ে এসএসসি এবং ৮০ দিন ক্লাস করিয়ে এইচএসসি পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা আছে। এদিকে শিক্ষাবোর্ডগুলো ইতোমধ্যে এসএসসি পরীক্ষা নেয়ার প্রস্তুতি শেষ করেছে। তৈরি হয়ে গেছে প্রশ্ন। বিষয়টি নিশ্চিত করে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা দৈনিক শিক্ষাডটকমকে জানান, পরীক্ষার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হবে। আমরা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস অনুসারেই প্রশ্ন তৈরি করছি। পরীক্ষার জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতেই হবে। যেহেতু এটি একটি পাবলিক পরীক্ষা। সরকার ঘোষণা দিলে ১৫ দিনের মধ্যেই পরীক্ষা নিতে পারবে শিক্ষা বোর্ডগুলো-সেরকমভাবেই প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন
Website Design and Developed By Engineer BD Network