আপডেট: এপ্রিল ১১, ২০২৬
নেক্সটনিউজ ডেস্ক : মা, মাটি ও মানুষ; জীবনে এই তিন নিয়ে জীবন অতিবাহিত করেছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। দশ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তাই পরিবারে বড় ভাই নামে পরিচিত। পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রেরও বড় ভাই নামে পরিচিত। দেশের সেবাবায় ট্রাস্টি বোর্ড করে ১৯৭২ সালে সাভারে গড়ে তুলেছিলেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র।১১ এপ্রিল তাঁর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।
ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী নাম শুনলেই প্রথম যা মাথায় আসে তা হলো তার প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। যে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষ স্বল্পমূল্যে পাচ্ছেন আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা। মানবতাবাদী এই চিকিৎসক তার জীবনের সবটাই দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। নিজের ভালো ক্যারিয়ারের চেয়ে দেশপ্রেমকে প্রাধান্য দিয়েছেন সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদক স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া এই মানুষটি।
ডা. জাফরুল্লাহর জন্ম ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে। তার বাবার শিক্ষক ছিলেন বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্যসেন। পিতামাতার দশ সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। পুলিশ কর্মকর্তা বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট উত্তীর্ণ হন তিনি। তিনি ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস এবং ১৯৬৭ সালে বিলেতের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস থেকে এফআরসিএস প্রাইমারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর সেনানি ও সংগঠক। লন্ডনে রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসে এফআরসিএস পড়ার সময় শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। যুদ্ধ শুরুর পর জনসম্মুখে তৎকালীন পাকিস্তানি পাসপোর্ট ছিড়ে ফেলেন তিনি। তখন তিনি এফআরসিএস চূড়ান্ত পর্বের শিক্ষার্থী। দেশের প্রতি ভালবাসায় তিনি তার ডিগ্রি ও উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছেড়ে চলে আসেন। লন্ডন থেকে ভারতে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার লক্ষ্যে আগরতলার মেলাঘরে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে গেরিলা প্রশিক্ষণ নেন। এরপর দেশে এসে যোগ দেন সম্মুখ সমরে। গেরিলা যোদ্ধা থেকে হয়ে উঠেন রণাঙ্গনের চিকিৎসক।
যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়ে একটি গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, আমার পাশে আমার মা থাকবে না, সে দেশে থেকে লাভ আছে? আমার মা বাংলাদেশে ছিল, আমি বিলেতে ছিলাম। আমার মায়ের নির্দেশ ছিল দেশ রক্ষা করো। সে নির্দেশ মেনে আমরা তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।
যুদ্ধে আহত মুক্তিকামী মানুষকে সেবা দিতে বন্ধু ডা. এমএ মবিনের সহায়তায় ডা. জাফরুল্লাহ গড়ে তোলেন ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট ‘বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল’। তিনি স্বল্প সময়ের মধ্যে অনেক নারীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য জ্ঞান দান করেন। যা দিয়ে তারা যুদ্ধে আহত রোগীদের সেবা করতেন। ত্রিপুরার ওই ফিল্ড হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করে অগণিত মুক্তিযোদ্ধা ফিরেছিলেন যুদ্ধের ময়দানে। তার এই অভূতপূর্ব সেবা পদ্ধতি পরে বিশ্ববিখ্যাত জার্নাল পেপার ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত হয়।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, একবার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ বলেছিল, আমার ৫০ জন আহত হবে, আমি ৫০০ জন দিয়ে তাদের রিপ্লেস করবে। জবাবে আমি বলেছিলাম, এটা হবে না। এরা যদি ফিরে না যায়, তাহলে মানোবল হারিয়ে যাবে। এরা যদি অকর্মণ্য হয়ে যায় তাহলে অন্যরা পিছিয়ে আসবে। আমি তাদের সুস্থ করে আবারও যুদ্ধের ময়দানে পাঠাব। আমাদের লক্ষ্য ছিল এদের দ্রুত যুদ্ধে ফেরত পাঠানো। আমরা তাতে জয়ী হয়েছিলাম।
তার প্রতিষ্ঠিত ফিল্ড হাসপাতালেই তিনি প্রথম প্যারমেডিকের ধারণা তৈরি করেন। একইসঙ্গে আহত ও নির্যাতিতদের বিদেশি সাহায্যের জন্যও কাজ করেন তিনি। বাংলাদেশের যুদ্ধে সাহায্যের জন্য বিদেশি বন্ধুদের কাছে সাহায্য চেয়ে চিঠিও লিখেছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী।
স্বাস্থ্য খাতে অবদান-
স্বাধীনতার পর ত্রিপুরার ফিল্ড হাসপাতালকে রাজধানীর ইস্কাটনে আনা হয়। এর নাম রাখা হয় বাংলাদেশ হাসপাতাল। ওই বছরই ছয়টি তাবু নিয়ে সাভারের মির্জানগরে শুরু হয় ডা. জাফরুল্লাহর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রা। এর নাম দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠানটিকে ২৩ একর জমিও দান করেন। এছাড়া তার বন্ধু ডা. মাহমুদুর রহমানের মা জহুরা বেগম দেন আরও ৫ একর জমি।
প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষকে সেবা দিতে প্যারামেডিকেল শিক্ষা দিয়ে এতে মাঠপর্যায়ের জনগণকে সম্পৃক্ত করেন ডা. জাফরুল্লাহ। এ বিষয়ে ১৯৭২ সালে ধারণাপত্র প্রকাশ করেন তিনি। যা ১৯৭৮ সালে কাজাখস্তানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অ্যালমাটা ঘোষণায় স্বীকৃতি পায়। তিনিই প্রথম দেশে গ্রামীণ স্বাস্থ্যবীমা চালু করেন।
স্বাস্থ্য খাতে ডা. জাফরুল্লাহ অবদানের কথা আসলেই আলোচনায় আসে ঔষধ নীতি প্রণয়নে তার ভূমিকা। যার উপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বর্তমান ওষুধ শিল্প। ১৯৮২ সালে প্রণীত ঔষুধ নীতির অন্যতম রূপকার ছিলেন প্রতিভাবান এই চিকিৎসক। যার ফলে দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো একটি শক্ত ভিত পায় এবং দেশের মানুষ কম দামে ওষুধ পায়।
এছাড়াও সহজ ভাষায় সাধারণ জনগণকে স্বাস্থ্য বিষয়ক বার্তা দিতে ১৯৮০ সাল থেকে প্রতি মাসে প্রকাশিত হচ্ছে ‘মাসিক গণস্বাস্থ্য’। দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ ডায়ালাইসিস সেন্টার ঢাকায় গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে। যেখানে স্বল্পমূল্যে ডায়ালাইসিসি সেবা দেওয়া হয়। অতি দরিদ্র মানুষকে দেওয়া হয় বিনামূল্যে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অবদান-
স্বাধীনতার পর থেকে নারী অগ্রযাত্রা বেগবান করতে স্ত্রী শিরীন হকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তার প্রতিষ্ঠিত গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে নারীদের কাজের পরিবেশ ও ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সব কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা সমান তালে অংশ নিয়েছে। দেশের প্রথম পেশাদার নারী চালক তার প্রতিষ্ঠানে। পাশাপাশি গণস্বাস্থ্যে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্যও চাকরির সুযোগ করে দিয়েছেন তিনি।
সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিতে প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোতে অন্য যেকোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অত্যন্ত কম মূল্যে শিক্ষার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে ও নামমাত্র মূল্যে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগও রেখেছেন তিনি। ব্যবসায়িক চিন্তার বাইরে মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকে প্রাধান্য দেওয়া হয় ওইসব প্রতিষ্ঠানে।
সামাজিক কাজের পাশাপাশি দেশের সব রাজনৈতিক সংগ্রামেও সরব থেকেছেন ডা. জাফরুল্লাহ। নাগরিক অধিকার আদায়ের মিছিলে থাকে সরব উপস্থিতি। লুঙ্গি পড়ে, হুইলচেয়ারে করে আন্দোলন-সংগ্রামে উপস্থিত থাকেন আজীবন সংগ্রামী এই মানুষটি। এ জন্য নানা সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের রোষানলেও পড়তে হয়েছে তাকে। একাধিক মামলার কবলেও পড়তে হয়েছে।
পুরস্কার ও সম্মাননা-
সারাজীবন মানুষের কল্যাণে বিলিয়ে দেওয়া মানুষটি অন্যের জন্যই কাজ করেছেন আজীবন। এর বিনিময়ে মানুষের ভালবাসা ও দেশি-বিদেশি অনেক সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি ১৯৭৭ সালে তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার স্বাধীনতা পদক লাভ করেন। ফিলিপাইন থেকে ১৯৮৫ সালে রামোন ম্যাগসেসে এবং ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে বিকল্প নোবেল হিসেবে পরিচিত রাইট লাভলিহুড, ২০০২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো’ এবং মানবতার সেবার জন্য কানাডা থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি পেয়েছেন। ২০২১ সালে আহমদ শরীফ স্মারক পুরস্কার পান এই গুণী চিকিৎসক।
দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এছাড়া গত কয়েকদিন ধরে তিনি বার্ধক্যজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় গত ৫ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। এরপর গত রোববার তার চিকিৎসায় মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় গত সোমবার (১০ এপ্রিল) সকালে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। গতকাল মঙ্গলবার (১১ এপ্রিল) রাত সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর ধানমণ্ডির গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।